নতুন ফেরিওয়ালা - বদরুদ্দোজা শেখু


এক মাসের বেশী লকডাউন চলছে।
নিয়াল্লিশপাড়ার দীপক মন্ডল গ্রাজুয়েট। বয়স ছত্রিশ পার হয়েছে। এখনও সে চাকরি পায়নি। তাই বাড়ির কাছেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে টিউশন পড়ায়। বাড়িতে বয়স্ক মা-বাবা, স্ত্রী ও এক মেয়ে আছে।  বাবা বেসরকারী ড্রাইভার ছিলো, এখন পারে না।  দীপক স্কুল মাস্টার নয়, তাই তার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কিছুতেই বাড়ে না।
লকডাউনে টিউশন পুরোপুরি বন্ধ। কাজেই দীপকের আয় একদম বন্ধ। সংসারে ঘোর টানাটানি শুরু হয়েছে। কিছু একটা উপায় না করলেই নয়। এখন কাজ দেওয়ার তো কেউ নাই। তার দু-একজন বন্ধুর সাথে ফোনে ফোনে  আলাপ ক'রে সে জানলো তারা এখন  সব্জি-ফল সাইকেলে ক'রে ফেরি করা শুরু করেছে। বহরমপুরের জজ কোর্টের পিছনে বা কাশিমবাজার বানজেটিয়া এলাকায় অনেক নতুন বাড়ি হয়েছে। তারা নতুন বাজারে ফল-সব্জি কিনে সাইকেলের ক্যারিয়ারের দু'পাশে বাঁশবাতা দিয়ে বাঁধা ঝুড়িতে ভ'রে নেয়। আর গলির ভিতর দিয়ে ওসব জায়গায় চ'লে যায় যাতে পুলিশ দেখতে না পায়।
তারপর বেলা দু'টো তিনটে অবধি ফেরি করে। ওইসব বাড়ির লোকজন এখন বাজারে তেমন বেরোচ্ছে না। তাই ভালোই বিক্রি হয়, দিনে অন্ততঃ চার-পাঁচশো টাকা থাকে। তারা দীপককে এই কাজ ধরার পরামর্শ দিলো।
লকডাউন কবে উঠবে অনিশ্চিত। তাই সাতপাঁচ ভেবে দীপক সব্জি ফেরির কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলো। মা, স্ত্রী দুজনেই বারণ  করেছিলো। স্ত্রী বলেছিল, ওকাজ তুমি পারবে না। দীপক শুনেনি। বাড়িতে তো সাইকেল আছেই। দুটো বাঁশের লাঠি, দুটো ঝুড়ি  আর দড়ি যোগাড় ক'রে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে নিলো। আর দাঁড়িপাল্লা, বাটখারা, ব্যাগ ইত্যাদি  নিয়ে সে প্রথম দিন ভোর ভোর ঠাকুরের নাম নিয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বহরমপুরের নতুন বাজারে চলে এলো সব্জি কেনার জন্য।
সেতো এই ব্যবসার কিছুই জানে না। সাবির বলেছে খুব তাড়াতাড়ি যা নেওয়ার নিতে হবে, নইলে পুলিশ ধরলে মুশকিল হবে। মুখে মাস্ক রুমাল গামছা বেঁধে সবাই প্রায় ঠেলাঠেলি ঘেঁষাঘেঁষি ক'রে কেনাকাটি করছে। সামাজিক দূরত্বের বালাই নাই। পুলিশ তখনো দেখা গেল না।
সে সব্জি কেনার একটা লিস্ট ক'রে রেখেছিল সেইমতো প্রথম দিন একটু কম কম  আনাজপাতি কিনে  গঙ্গার রোডের দিক দিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময় পুলিশ  লাঠি চালাতে শুরু ক'রে সবাইকে ভাগাতে লাগলো। ওরা ঠিক চিনে রাখে কে পুরনো আর কে নতুন। গন্ডগোলের মধ্যে প'ড়ে দীপক হুবকানা। পুলিশ ধাক্কা দিয়ে তার সাইকেল ফেলে দিলো,   তার হাতে পায়ে গায়ে বেধড়ক লাঠি চালালো। সব্জিগুলো গড়িয়ে পড়লো।
একটা পুলিশ কানের কাছে বললো, 'টাকা দিয়েছিস? তোল্ সাইকেল আর যা পালা।'
সে বিস্মিত! সাবির তো পুলিশকে টাকা দেওয়ার কথা বলেনি। সে গোঁয়াতে গোঁয়াতে সাইকেলটা তুললো। পুলিশ হাঁকলো, ' নোংরা সব্জি তুলবি না। ভাগ!'
খোঁড়াতে খোঁড়াতে দীপক গঙ্গার ধার দিয়ে সাইকেল নিয়ে হেঁটে চলেছে। দীপকের চোখে জল চ'লে এলো। যে ক'টা টাকা সম্বল ছিলো তাও মারা গেলো।
সে অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত কোন্ মুখে বাড়ি  যাবে?

-
বদরুদ্দোজা শেখু, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ



No comments:

Post a Comment