কোয়ারেন্টাইনের একটি দুপুর - ভাস্কর মন্ডল


।১।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে দীর্ঘ ছুটি চলছে স্কুলে। আমি ও পড়ানোর ছুটি দিয়েছি। মা ও আমি এক রকম গৃহবন্দী। আজ প্রধানমন্ত্রী জনতা কার্ফু ‘ ঘোষণা করেছেন। মফস্বলের একটা ভাড়া বাড়িতে আমাদের সারা দিন কাটে। কাজের দিন গুলো অবশ্য কয়েক ঘণ্টার জন্য, বলতে গেলে রাত টুকু বাসায় ফিরে আসা। মাইক ট্রাফিক হইচই। আজ বাথরুমে স্নানের জল ভরতে ভরতে, পাশের বাগান থেকে একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। ইশৎ কর্কশ, কিন্তু মধুর। থেকে থেকে, একটা আজানের মৃদু স্বর ভেসে আসছেএত সুন্দর যে, ইচ্ছা করছে, স্নান থামিয়ে রেকর্ড করি! কিন্তু এতই হালকা! যদি গান বানাতে পারতাম, তাহলে এই সুরে কথা বসাতাম। 


।২।
অনেক দিন পর মা আর আমি দুপুরে একসাথে খেতে বসলাম। মুচমুচে উচ্ছে ভাজা গরম ভাতে মাখতে মাখতে, মা বললো, কাকিমাদের পুকুর গুলোচ্ছে। কই মাছ, ফলুই মাছ পেয়েছে। 
দুপুর গড়িয়ে গেছে। এখন অবশ্য ওদের অনেক জনের গলা পাচ্ছি। আমি বলিএকে পুকুর মারাবলে, না
- যখন ছোট্ট ছিলুম, তখন কত্ত পুকুর গুলোন দেখেছি। মাছ ধরেছি ভাই বোন দাদা দিদি মা কাকিদের সাথে! তখন গোটা গ্রাম কে জানিয়ে দেওয়া হতো। সবাই মাছ ধরতে নামতো। শেষে সবার থেকে মাছ নিয়ে, আবার ভাগ করে দেওয়া হবে। কী দিন ছিল! কত জল কাদা ঘেঁটেছি!  কোথা ছিল জীবাণু! কোথা ভাইরাস! 
এখন ভাতে সজনা ডাঁটা-মাছ-সব্জির পাতলা ঝোল মাখতে মাখতে মা বলে চলে, তখন শরীর খারাপের পর মা যখন এমন পাতলা ঝোল দিয়ে পাঁক করে ভাত মেখে দিতো, মনে হতো অমৃত! আরও খাই, আরও খাই! কিন্তু, দিতোনি। মার দিকে এক পলক দেখে মনে হয়, সব মাই এক রকম! তার সাথে তার সন্তানের গল্প গুলোও একই থেকে যায়। সেই এক খেলনা বাটি। তবু, সবার খেলা হয় না। পাখিটা এখনও ডাকছে। পাড়ার মোড় শুনশান। 
মা বলে চলে, একবার জ্বর হয়েছে। কদিন ভাত দেয় নি। আমাকে দুধ সাবু খাইয়ে মা রান্না ঘরে চলে গেছে। বিছানায় শুয়ে শুনছি রান্না ঘরের বারান্দায় হইচই করে সপরিবারে সবাই দুপুর বেলা খেতে বসেছে। আমার খুব খিদে পাচ্ছে, মনে হলো। জানালা দিয়ে দেখলুম বাগানে টক টাবা লেবুর গাছ। ও-যে জোয়ানে দিই যে লেবু। হলুদ হয়ে পেকে আছে। আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে পেড়ে আনি। খোলা ছাড়িয়ে গোগ্রাসে খেতে থাকি। কী ভালো!  কী ভালো! কেউ জানে নি। জানলে পিঠ আস্ত থাকবে! 

।৩।
ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের গভীরে। সব ইচ্ছেই নিঃস্পাপ, অকপট। অথচ সব ইচ্ছে পূরণ হয় না। সব ইচ্ছে পূরণ করতে নেই। কেন নেই? কেন কিছু ইচ্ছের ঠোঁট সেলাই করি আমরা? আর পাড়ার মোড়ের মত কার্ফুর নিরবতা নামলেই সব ইচ্ছেরা, পাখির ডাকে মুখরিত করবে নির্জন চৈত্রের দুপুর।
মা আর আমি হেসে লুটোপুটি খাই পুরনো এক রসিকতায়। আমাদের এক গ্রাম্য আত্মীয়ার সরল কিছু কথাবার্তা নিয়ে আমারা খুব হাসি। এত বার, অসংখ্য বার বলে শুনেও পুরনো হয় না! বিরাট কিছু রম্য রচনা হবে না এটা নিয়ে, তবু অকৃত্রিম আনন্দের।

ইচ্ছেরা, থুড়ি পাখিরা স্বর পাল্টে ডাকতেই থাকে, ডাকতেই থাকে।



-
ভাস্কর মণ্ডল


No comments:

Post a Comment