হাসান উজ জামান আনসারি


নির্মম পৃথিবীর এক নগ্ন দোত্যক 'কমলা রকেট'

পরিচালক নূর ইমরান মিঠুর প্রথম চলচ্চিত্র কমলা রকেট। এর আগে তার কোনো কাজ দেখার সুযোগ  ছিল না তাই তাকে, তার কাজকে তেমন ভাবে চিনতাম না। তবে মোশাররফ করিম আর তৌকীর আহমেদদের অবশ্য চিনি, তারা এই চলচ্চিত্রের মুখ্য অভিনেতা, চিনি তাদের অভিনয়-পরিচালনা দেখেই।
তৌকীর আহমেদ একজন দক্ষ চিত্র পরিচালক। অজ্ঞাতনামা, জালালের গল্পের মত অসাধারণ চলচ্চিত্রের উপহার দিয়েছেন দর্শককে। জামালের গল্পে আছে জীবনের আবহমান এক নির্মম সত্যের কথা- অবাঞ্ছিত সন্তান। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অবাঞ্চিত সন্তান যে কী রকম ভাবে সমাজের সমান্তরালে চির সাব-প্লটের মত বেঁচে থাকে সেই নিয়েই গল্প। অন্য চলচ্চিত্রটি 'অজ্ঞাতনামা।' নাম পরিচয়হীন এক লাশের কাফন দাফন নিয়ে এক অসাধারণ সংবেদনা মূলক ছবিতে সমাজের বিভিন্ন দিক নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। এমন একজন পরিচালককে পরিচালক মিঠু তার চলচ্চিত্র 'কমলা রকেট'-এ ব্যবহার করেছেন এ বিষয়টিই বেশ আশ্চর্যের।
মোশাররফ করিমের সাথে পরিচয় অবশ্য অনেক গাঢ়। না, ব্যক্তিগত পরিচয়ের কথা বলছি না। তাঁকে চিনি তার অভিনয় দেখে। একাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে ভাঙতে যেমন পারেন, গড়তেও পারেন অস্বাভাবিক ভাবে। তাকে দিয়েও একটি বিশেষ চরিত্রে এই চলচ্চিত্রে কাজ করিয়ে নিয়েছেন পরিচালক।
নদী মাতৃক দেশ বাংলাদেশ। এদেশের শিরায় শিরায় তাই নদী জলের ক্ষত। আর এই নদীপথকে আশ্রয় করেই গড়ে উঠেছে এদেশের ব্যাপক যান চলাচলের ব্যবস্থা।  বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণ জেলাগুলোতে যাতায়াতের জন্য অন্যতম উল্লেখযোগ্য মাধ্যম স্টিমার। এই রকমই এক স্টিমারের নাম 'কমলা রকেট'। সেই স্টিমারের মধ্যে ঘটা দুই দিনের ঘটনা পর্ব নিয়েই নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি।
বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের এক বহুজাতিক সংস্থার বহুতল ভেঙে মারা যান বহু মানুষ। সে খবর শিরোনাম হয়েছিল দেশ বিদেশের একধিক সংবাদ পত্রে। এ চলচ্চিত্রটি অবশ্য সেই মূল ঘটনাটির উপর ভিত্তি করে নির্মিত নয়। তবে তেমন ধারার এক ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে যায়। আর সেই আগুনে পুড়ে যায় বেশ কিছু শ্রমিক। চলচ্চিত্রটির প্রথমেই শোনানো হয় সেই ফ্যাক্টরীতে আটকে পড়া এক মহিলার কন্ঠস্বর। তিনি তার স্বামী, পেশায় রিকশা চালককে ফোন করে বলছেন যে তিনি আটকে পড়েছেন। তারপরের দৃশ্যে দেখানো হয়, লাশটিকে কফিনে পুরে কমলা রকেট-এ তুলছেন মহিলাটির স্বামী, তার বন্ধু মোশাররফ করিম এবং অন্যান্য জন।
আর্থিক বৈষম্য যে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির এক নির্মম সত্য সে সাক্ষ্য বহন করে এদেশগুলোর যানবাহনগুলিও। প্রথম শ্রেণীতে যেমন আছে উগ্র বিলাসিতা, তেমন তৃতীয় শ্রেণীতে তিল ধারণের জায়গাহীন নিদারুণ দুর্ভোগ। কমলা রকেট-এর প্রথম শ্রেণীতে তাই জায়গা হয় যে ফ্যাক্টরীতে আগুন লেগে যায় তার মালিক তৌকীর আহমেদের। অন্যদিকে বলা বাহুল্য, তৃতীয় শ্রেণীর ভিড়ে কোনো রকমে জায়গা হয় মৃত মহিলাটির লাশের এবং তার স্বামীর। ঠিক এই রকম এক মুহূর্তে কমলা রকেট হয়ে নির্মম পৃথিবীর এক নগ্ন দোত্যক, যেখানে একই পাটাতনে ঘুরে বেড়ায় শাসক ও শোষক।
ফ্যাক্টরীর মালিক চরিত্রে তৌকীর আহমেদের অভিনয়কে ছাপিয়ে গিয়েছেন একজন পুস্তক বিক্রেতা এবং পতিতা কারবারীর চরিত্রে অভিনয়কারী মোশাররফ করিম। বরাবরের মতই নিজের কমফর্ট জোন থেকে বেরিয়ে এসে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম।  বাসে, ট্রেনে প্রায়ই দেখা যায় একদল হকার নিজস্ব বাচন শৈলীকেকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে নিজস্ব সামগ্রী বেচে থাকেন।  এহেন এক অভাবনীয় চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেছেন তিনি। চিত্র নাট্যের প্রয়োজনে আরো কিছু সংলাপ তৌকীর আহমেদকে দিতে পারতেন পরিচালক, তবে এ বিষয়ে বলতেই হয় চলচ্চিত্রটি যতটা না সংলাপধর্মী তার থেকে বেশি চিত্ররূপময়। অসাধারণ কাজ করেছেন চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফার। স্টিমারটির বাস্তুতন্ত্রের সাথে সাধারণ দর্শকের পরিচয় করিয়ে দিতে সুচারু ভাবে তুলে ধরেছেন স্টিমারটির মধ্যে ঘটে যাওয়া অতি তুছাতিতুচ্ছ ঘটনা। চলচ্চিত্রটির স্টোরি লাইন এক রৈখিক হওয়ার কারণে ১ঘন্টা ৩৫ মিনিটের এই ছবিটি একটু দীর্ঘ মনে হলেও, সব মিলিয়ে সবাইকে ভালোই লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস।

No comments:

Post a Comment