ভীষণ হইচইতে যমরাজের ঘুম ছুটে গেল। রাগে
আগুন হয়ে যমরাজ হেঁড়ে ডাক দিলেন – চিত্রগুপ্ত, একি হচ্ছে? চারিদিকে এত গণ্ডগোল কিসের?
চিত্রগুপ্ত পিঁড়ির উপর উপুড় হয়ে নাক ডেকে
নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছিলেন। হঠাৎ এমন হেঁড়ে আওয়াজ শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তড়াক্ করে
লাফিয়ে যমরাজের পায়ের কাছে ছিটকে পড়ে বললেন – কি… কি... কি হয়েছে প্রভু?
- সারাবেলাতো ঘুমিয়ে কাটালে। কি খোঁজ খবর রাখো? এরকম করে আর কদিন চলবে? একদিন দেখবে মর্ত্যের মানুষ এসে পেন্দিয়ে পোস্তা
বানিয়ে দেবে। যাও, গিয়ে খোঁজ নাও। অফিসের বাইরে এই অসময়ে এত হল্লা কিসের?
চিত্রগুপ্ত চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাইরে গিয়ে
চক্ষু ছানাবড়া। ছুটে এসে যমরাজকে বলে – মাফ করেন, প্রভু। বড্ড ভুল হয়ে
গেছে। লাখ খানেক ভূত-প্রেত এসে হল্লা করছে। স্বর্গ-নরকে তিল
ধারনের জায়গা নেই। এতজনে থাকবে কোথায়?
- কি বল কি চিত্রগুপ্ত!
এমন বিভ্রাট হল কী করে? পাজি, নচ্ছার কোথাকার। অকর্মার ঢেঁকি! আবার কেলিয়ে হাসি হচ্ছে? দাঁড়াও হাসি বের
করাচ্ছি।
- প্রভু, ভুল হয়ে গেছে,
স্যার।
- (তেলেবেগুনে জ্বলে
উঠে) তোকে না কতবার বলেছি আমাকে ‘স্যার’ বলবি না। ‘প্রভু’ বলবি।
- থুড়ি। প্রভু স্যার।
- তা কি করে এতবড় ভুল
হল শুনি? (রাগের
চোটে) কি এমন মহৎ কর্মে মগ্ন ছিলে, বাবা?
- না প্রভু। এতে আমার
কোন ত্রুটি নেই। ওই করোনার জন্যই এত কাণ্ড ঘটেছে।
- করোনা? (অবাক হয়ে) সে আবার
কে?
- একজন যমদূত। গেল
জানুয়ারীতে নিয়োগ করা হয়েছে, প্রভু।
- আমি জানলাম না নিয়োগ
হয়ে গেল। আমার সাধের নরক দুর্নীতিতে ভরে গেল। এবার নরকেও ঘাপলা শুরু হয়ে গেল।
- ঘাপলা কোথায় প্রভু?
প্রতি
বছর মর্ত্যের মানবসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যমদূত নিয়োগ করা হয়। গত পাঁচ-সাত বছর
নিয়োগ হয়নি। কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল। সীমিত কর্মচারীর উপর চাপ বাড়ায় কথায়
কথায় ধর্মঘট হচ্ছিল। যমদূত নিয়োগে আপনার গা-ছাড়া মনোভাব দেখায় আমি নিজে উদ্যোগী
হয়ে কয়েকজন যমদূত নিয়োগ করেছি, প্রভু।
- (একটু থতমত খেয়ে, পরে নিজেকে সামলে
নিয়ে) তুমি আমার কর্মচারী হয়ে আমারই ভুল ধরো! এত বড় আস্পর্ধা?
- (দু হাত জড়ো করে)
মাফ করবেন, প্রভু।
- আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে। যাও
করোনাকে ডাকো।
খানিকবাদে চিত্রগুপ্ত চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে এক
কালো কুচকুচে শক্ত-সমর্থ জোয়ানকে ধরে নিয়ে এল। মাথায় তার ভয়াল ভয়ঙ্কর মুকুটের সাজ
দেখে যমরাজ অট্টহাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – তোর মাথায় একি সাজ?
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে করোনা বলতে লাগল – কি বলব হুজুর। মানুষরা আজকাল যমদূতের ভয় পায় না। উল্টে উপহাস করে।
ডাক্তার বলে এক রকমের লোকেরা রীতিমত মানুষকে মরতেই দেয় না। তাই অনেক রকম ভয়টয়
দেখিয়ে, কখনও
কখনও ধমক টমক দিয়ে কসরত করে তবেই কাজ সমাধা করতে হয়। আর কখনও কখনও ...
- থাম, থাম, থাম। কথায় কথায় খই
ফোটাতে হবে না। এত বড় ভুল হলটা কি করে?
- কাঁদো কাঁদো গলায়) আমার
কোন ভুল হয়নি, স্যার।
- তবে কার ভুল শুনি?
- (কয়েক তাড়া কাগজ
দেখিয়ে) চিত্রগুপ্ত স্যার একদিন এইগুলো দিয়ে বললেন যা
এদেরকে যত তাড়াতাড়ি পারিস নরকে নিয়ে আয়।
চিত্রগুপ্ত - এ্যয় এ্যয় ব্যাটা
নচ্ছার। তোকে আমি এতগুলো কাগজ দিয়েছিলাম? যে যার কাজ যে যার নামে লিখিত আছে। কোন দেশে কে
ডিউটি করবে তা ভাগ করা আছে। তোকে তো শুধু তোর নামের কাগজটা নিতে বলেছিলাম।
যমরাজ - এই ব্যাটা,
তোর
কোয়ালিফিকেশন কি?
করোনা- স্যার, আমি ফোরে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পাশ করতে
পারিনি।
যমরাজ- এ্যাঁ! একি শুনছি চিত্রগুপ্ত । তুমিতো জানো, আপাতত মিনিমাম গ্র্যাজুয়েশন ছাড়া নিয়োগ হয়
না। নরক রাজ্যে একি বেনিয়ম! একি দুর্নীতি!
চিত্রগুপ্ত- ব্যাটা! নচ্ছার! তখন গ্র্যাজুয়েশনের
সার্টিফিকেট দেখিয়ে এখন বলা হচ্ছে ফোর পাশ করতে পারিনি।
করোনা- এখন আমাকে বকছেন কেন?
আমিতো
তখন সব সত্যি বলেছিলাম আপনিতো আমাকে বললেন যদি আমি আপনাকে মর্ত্য থেকে প্রতিদিন
দুবেলা দুছিলিম করে গাঁজা এনে দিতে পারি তবে নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে নিয়োগ দেওয়া
আপনার কাছে নস্যি।
যমরাজ- নকল সার্টিফিকেট! এ কথা শোনার আগে
আমার মৃত্যু হল না কেন? (নিজেকে সামলে নিয়ে) না না না, এ আমি কি পাগলের
প্রলাপ বকছি? যমরাজের কি মরণ হয়! যাকগে, দেখোতো চিত্রগুপ্ত, কতজনে আগাম শমনবার্তা পেয়েছে?
চিত্রগুপ্ত- (কাগজের তাড়িগুলোতে চোখ বুলিয়ে) তা প্রায় এক
কোটি হবে।
যমরাজ- এতজনে রাখবে কোথায়? সকল ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। শাসনতন্ত্র যে
অচল হয়ে পড়বে।
এমন সময় দরজায় ধাক্কাধাক্কির ও কোলাহলের
শব্দ শোনা গেল।
যমরাজ- যাও চিত্রগুপ্ত, দেখো দরজায় ভালো করে
ছিটকিনি লাগানো হয়েছে কিনা। না হলে যাও ভালো করে ছিটকিনি লাগিয়ে আসো। কখন কি অঘটন
ঘটে যায় তার ঠিক নেই।
চিত্রগুপ্ত- ঠিকঠাক লাগানো আছে, প্রভু।
যমরাজ- দেখোতো চিত্রগুপ্ত, কতজনে মর্ত্য থেকে
তুলে আনা হয়েছে?
চিত্রগুপ্ত- তা প্রায় কুড়ি লক্ষের মতন হবে।
একথা শুনে অ্যাঁ অ্যাঁ গোঁ গোঁ করতে করতে
যমরাজ সিংহাসনে ঢলে পড়লেন।
চিত্রগুপ্ত ব্যাঙের মত লাফিয়ে লাফিয়ে ‘জল আনো, জল আনো’ বলে ঘরের ভেতর দৌড়
লাগালেন।
-
No comments:
Post a Comment