শেষ আশ্রয় - তাপস তালুকদার


কেউ কাউরে ভুলতে পারেনা, শুধু ভুইল্যা থাহার অভিনয় করে।আর কিছু পারুক না পারুক মাইনষে অভিনয় ভালা পারে।পৃথিবীতে আমরা বেহেই পাক্কা অভিনেতা। বর্ষন শেষে যেমন কইরা রোদ তির্যক হইয়া ফিরা আসে, তেমন কইরা কেউ জীবন থাইক্যা ঝইরা গেলেও তার স্মৃতি ফিরা আহে। 
এতোক্ষন কি জানি ভাবতেছিলো হুসেন মিয়া! ঘোরের ভিতরে চইল্যা গেছিলো।এরশাদের ডাকে তার ঘোর কাটলো, চমকাইয়া উঠলো বিজলির লাহান...
- চাচা কি ভাবতেছো?
- কিছু ভাবিনারে বাজান।
- চাচা? চাইলেই কি হগলকিছু আড়াল করা যায়? তুমি চাচীর কথা ভাবতেছিলে।
- তুই একমাত্র আমারে বুঝবার পারোস, জগতের হগলে হগলরে বুঝবার পারেনা। তুই একমাত্র মানুষ যে আমারে বুঝস।
- হইছে বাদ দেও অহন!
- আব্বা ভাত নামাইছি দুইডা খাইয়া যাইয়ো? এরশাদ ভাই আপনেও দুইডা খাইয়া যাইয়েন। এরশাদ ফিরা চায় জুঁই এর দিকে। জুঁই হুসেন মিয়ার একমাত্র কন্যা। যেইদিন জুঁই এর জন্ম হইছিলো, সেইদিন হুসেন মিয়ার বাড়ির জুঁইগাছে ফুল ফুটেছিলো। তাই, আদর করে হুসেন মিয়া মেয়ের নাম রাখছে জুঁই।

-আব্বা ভাত ঠান্ডা হইয়া যাইবো, আইয়ো তাড়াতাড়ি। 
- এরশাদ আসো তুমিও চারডা খাইয়া লও, আইজ অনেকটা দূরে যাওন লাগতে পারে। ছমির শেখের মাইয়্যারে তার জামাই এর বাড়ি দিয়া আইতে হইবো।  হুনছি মাইয়্যারে যৌতুকের টাহা দিয়া পাঠাইবো।
- হু চাচা, আইতেছি, মুখডা ধুইয়া আসি পুকুর থাইক্যা।
*
ছমির শেখের মাইয়্যার জামাইয়ের বাড়ি কতোবড় দেখছো মিয়া এরশাদ? হু চাচা। আসলে কি জানো যাগো ধনসম্পদ থাহে, ওরা আরো চায়! নইলে মাইয়্যাডারে ক্যান আগে মাইরা-ধুইরা বাপের বাড়িতে পাঠাইছিলো।
- হু চাচা গরীবে তিন ওয়াক্ত পেট ভইরা খাইতে পারলে শান্তি।
- আইছো মিয়া এরশাদ, রাইতে আওনের পর থিইকা শরীলডা ভালো লাগতেছেনা।
- ইডা আবার কি কইন চাচা? দেখি শরীলডা। এরশাদ শরীরে হাত দিয়ে দেখে গায়ে প্রচন্ড জ্বর শরীলে ক্যামনে জ্বর বাধাইলেন
- আর কতো মিয়া? বয়স কি আর কম হইলো। এহোন শুধু মাইয়্যাডারে বিয়ে দিতে পারলেই শান্তিতে মরবার পারি।
- আচ্চা চাচা, তয়লে আমি আজ যাইগ্যা। আপনের জ্বরডা সারুক, তারপর কামের বাউ হইবোনে।
- আচ্চা বাপু যাওগা।
*
মধ্যে রাইত। এরশাদ মিয়া বিছানায় গড়াগড়ি করছে। তার ঘুম আসতেছে না। যেদিন তার মায়ের কথা স্মরণ হয় ঐদিন পুরো রাত তার ঘুম আসেনা। পৃথিবীর মানুষের প্রতি কতো ঘৃণা নিয়া তার মা মরেছে, এখন এরশাদ বুঝতে পারে। তার বয়স ছিলো তখন পাঁচ বছর। তার বাবা ছিলো একজন মদ্যপ এবং জুয়াচুর। যার কারনে প্রতিদিনই তার মা-বাবা ঝগরা লাগতো। তুচ্ছ কারনে এরশাদের বাবা তার মাকে প্রচন্ড মারধোর করতো। একদিন দিনে এরশাদকে পিঠা বানিয়ে খাওয়ালো, আঁচল দিয়ে ঘাম মুচে দিলো। রাত হলো নিয়ম করে, সকালে এরশাদের ঘুম ভাঙ্গলো তার বাবার চিৎকারে, তার মা তখন ঘরের এক যায়গায় ফাঁসের দড়িতে ঝুলছে। এসোব ভাবতে ভাবতে এরশাদ এর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
হঠাৎ করে বাহির থেকে হাঁক আসলো, এরশাদ ভাই! এরশাদ ভাই? জলদি করে ওঠেন। হুসেন চাচা জানি ক্যামুন করছে।
- কি কও! এরশাদ জলদি করে হুসেন মিয়ার বাড়িতে চলে গেলো।
- বাজান আইছো, আমার চোখের সামনে বহো তোমারে একটাবার দেইক্যা লই। আমার মাথাডা তোমার কান্ধে রাখোতো বাজান।
- চাচা আপনে এমোন অস্হির হইয়্যা উঠছেন ক্যারে?
- বাজান, কামলা মানুষ, সারাডা জীবন মাইনষের ঘরে কামলা দিছি, একবার খাইতে পারছি, পরের ওয়াক্তে না খাইয়া রইছি। এমোন অবস্থায় মাইয়্যাডারে বিবাহ দিবার পারিনাই। যৌত্তুকের টাহা বাজান জোগাড় করবার পারিনাই! যৌত্তুক ছাড়া কে বিয়া করবো মাইয়ারে?
- চাচা এসোব কথা পরেও কইবার পারবেন, এসোব কথা এহোন থুইয়া দ্যাইন।
- তোমার দুইডা হাত দেও তো বাজান, তোমারে একখান কথা কই রাখবা?
- চাচা আপনে এত্তো অস্হির হইলে চলবো? আপনের কিচ্ছু হইবে না।
- না বাজান, আমার শেষকালে তুমি কথা দাও, আমার মাইয়্যাডারে তুমি তোমার কাছে রাখবা? ওরে তোমার ঘরের বউ করবা? শেষকালে আমার এই ভরসাডা দিয়া দাও বাজান?"
- হ চাচা আমি রাখবো। জুঁইরে আমি আমার ঘরে তুইল্যা নিমু, বধূ সাজাইয়্যা।
- জুঁই? মা একটু এইদিকে আয়, তোরে জন্মের মতো দেইখ্যা লই। তোর হাত দুইডা দে মা? এই দুইডা হাত তোমার হাতে তুইল্যা দিলাম, তুমি কোনকালে কষ্ট দিওনা, আমার মা মরা মাইয়্যাডারে।
হুসেন মিয়া নিথর চোখে চেয়ে রইলো দুটি নিষ্পাপ মুখের দিকে। এরশাদ তার হাত দিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। বাবা হারানোর শোকে জুঁই এর চিৎকার সারা ঘরে কম্পন সৃষ্টি করে আকাশে মিলিয়ে যেতে লাগলো। এরশাদ পরম মমতায় জুঁইকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলো।

-
তাপস তালুকদার



No comments:

Post a Comment