খ্যান্ত পিসির বোধোদয় - অপর্ণা গাঙ্গুলী


এমনিতে খ্যান্ত পিসির সঙ্গে ধূর্জটি পিসের তেমন বনিবনা নেই বলেই জানি তবু এখন করোনা এসে অতি বড়ো শত্রুকেও বুঝি সমব্যাথী করে তুলেছেl এখন আর ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-মুচি-মেথর-হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নেইl শোনা যাচ্ছে, করোনার থাবা বিশাল বাজপাখির মতোই যে কাউকে তুলে ফেলছে আর দরকার মতো ধাপার মাঠে নিক্ষেপ করছেl
সক্কালসক্কাল খ্যান্ত পিসি ঘর ঝাঁট দিতে দিতে বলে উঠলেন, তা হ্যাঁ গা, ওই করোনা না কী যেন, ওতে মরলে নাকি ধাপার মাঠে নিয়ে ফেলছে?
ধূর্জটি পিসে সবেই খবরের কাগজখানা স্যানিটাইজ করে নিয়ে পড়তে উদ্যত হয়েছিলেনl খ্যান্তর এই অযথা বকরবকরে ঝাঁঝিয়ে বললেন, হ্যাঁ সেটাই হচ্ছেl সক্কাল সক্কাল কেমন প্রশ্ন?
পিসিও চড়াৎ করে বলে বসলেন, হ্যাঁ সক্কাল সক্কাল প্রশ্ন না করে ঝিগিরি করবো, কেমন? বাব্বা কি দিনকাল পড়লো গোl
ধূর্জটি প্রমাদ গণলেনl এই রে এই বুঝি জলখাবারটা ফস্কে যায়l আজ রবিবার খ্যান্ত লুচি আর সাদা আলুর তরকারি করবে বলেছিলো যেl
অতঃপর তিনি ময়দা-খাওয়া মিহি গলায় বললেন, আহা, তাই কি বলেছি খ্যান্ত? তবে কিনা সকাল সকাল নেতিবাচক কথাবার্তা...
নেতি!
হাতে ন্যাতা নিয়ে কোমর বাঁধেন খ্যান্ত পিসিl মেঝেতে একবার সড়াৎ করে ন্যাতাখানা টেনে নিয়ে ককিয়ে ওঠেন ভারীl ওগো আমার কি হবে গো, আমার যে ভারী ইচ্ছে ছিল তোমাকে রেখে মরলে দামি কড়িয়াল শাড়িখানা পরিয়ে নিয়ে যাবে গোl ওগো মেয়ে বৌমাদের সব বলে রেখেছিলুম যে গোl
পিসেমশাই দেখেন ব্যাপার বড়ো বেগতিকl এই করোনার অকরুণ রবিবারের সকালে বুঝি ওই সাদা ময়দার লুচি আর সাদা আলুর তরকারি অনেক করোনার মৃত্যুর মতোই ধামা চাপা পড়ে যায়l
বেতো পা নিয়ে উঠে এসে তিনি স্ত্রীর পিঠে হাত রাখতে যানl
লাঞ্চিতা সর্পিনীর মতো ফোঁস করে ওঠেন খ্যান্ত পিসিl দূর হটো! দূর হটো! এক মিটার দূরত্ব রাখো, বলে ঘরের বাইরে লাফ দেন খ্যান্ত পিসিl
ধূর্জটি পিসে রাগী হলেও অবুঝ ননl করোনার কৃপায় অল্পবিস্তর সকলেরই মানসিক বিষাদ উদয় হয়েছে, তা বলাই বাহুল্যl
সে যা হোক, পিসেমশাই সে যাত্রায় সোশ্যাল ডিস্টেন্সিঙমেনে যথাসম্ভব মোলায়েম সুরে খ্যান্ত পিসিকে বোঝালেন, ওগো বাড়িতে থাকলে করোনা আসবে না গোl আর তাহলে ধাপার মাঠে যাবার ভয়ও নেইl
খ্যান্ত কি বুঝলেন জানি নাl গোল মুখটাকে নাইনিতালের নতুন আলুরমতো করে বললেন, এই এতো আয়োজন, টাকাকড়ি-বাড়ি-গাড়ি, সব কিছুই কিছুনা বুঝলে গো? এই দেহটাও কিচ্ছু না। করোনা আসার পর আরো হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যেনl তারপর একটা হুশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, যাই, কবে আছি কবে নেই, দুটো লুচি ভেজে দিইগে তোমায়!
স্ত্রীর এই বোধোদয়ে, করোনার ভয় শিকেয় তুলে, ধূর্জটি পিসের মনটা গঙ্গাফড়িঙের মতো লাফালাফি করতে লাগলোl

-
অপর্ণা গাঙ্গুলী




No comments:

Post a Comment