আবদার - রাহুল দাস

এক গোছা কচু শাক মজে যাওয়া ডোবাটার পাশ থেকে তুলে নিজের উঠানের মাঝে এনে রাখলো জোবেদা। দিনকতক ধরে এই জুটছে তাদের। ঘরে তেল-নুনের বালাই নেই। জমির বেঁচে যাওয়া কিছু চালই সম্বল। সাকিনার আব্বা অনেক চেষ্টা করেও কারুর কাছ থেকে একতিল পয়সা আদায় করতে পারেনি। হ্যাঁ আদায়। কর্জ নয়। জমির ধানগুলো লকডাউনের আগেই চালান গেছে। কথা ছিল দিন দশেকের মধ্যেই হাজার দুয়েক টাকা পাওয়া যাবে। দুটো টাকাও জোটেনি। এর ওর বাড়ি ঘুরে দু-একবার ফোন ও করা হয়েছিল। তবে ওপাশ থেকে যান্ত্রিক আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই কানে আসেনি।

জোবেদা শুধু প্রাণ ভরে গাল পেড়ে ছিল রহমতকে। কিন্তু তার-ই বা দোষ কোথায়! বহু কষ্টে মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু জোগাড় করতে হয়েছিল ওকে। গ্রামের কেউই এগিয়ে আসেনি। শেষে চাল ব্যাপারীর হাতে পায়ে ধরে কিছু শর্তের বিনিময়ে জুটেছিল একফালি চাষের জমি আর একটুকরো মাটির ঘর। তারপরেই ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিল সাকিনা। আহা কী রূপ! খোদাতালা অনেক ফুরসতে যেন এক পরী গড়েছিলেন। যার ডানা দুটোই শুধু ছিল না। মহামারীর দৌলতে সেই রূপেও ভাটা পড়েছে।
সবুজ ছাউনি দেওয়া বাংলার গ্রাম গুলো অনাহারে দিন কাটালেও মহামারী কয়েক যুগ হল দেখেনি। আজ আবার রণবাদ্য বাজিয়ে তার আগমন ঘটেছে। হাড় বের হওয়া জীর্ণ পল্লীগুলো মেতে উঠেছে হাহাকারের খেলায়। সরকার বাহাদুর কিছু কম করছেন না। তবে যে দেশে জনগণনার পরিসংখ্যান শুধু খাতায় শোভা পায় সেখানে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কিছু করা বড় কঠিন। জোবেদার পরিবার সেই মস্ত পরিসংখ্যানের খাতার তলায় চাপা পড়ে গেছে।
ঘরের দাওয়ায় ইঁটের টুকরো হাতে বছর আটের সাকিনা কিসব এঁকে চলেছে।  জোবেদার আগমন  লক্ষ করে একটু মাথাটা তুলেই প্রশ্ন করলো, আর কিছু পাইলি না আম্মু? আমিনাদের বাড়ি থেইক্যা  মাছ ভাজার গন্ধ আসতেছে। আমার বড় খাইতে মন চায়...! এই বলে অঝোরে কেঁদে ফেললও।
মেয়ের এই অভিমানী কান্নায় জোবেদার বুকের ভিতর যেন কেউ মস্ত হাতুড়ির বাড়ি মারে। রহমত এসবের মাঝে এসে থতমত খেয়ে যায়। একরত্তি মেয়েটার আবদার মেটাতে না পেরে বসে পড়ে বাইরের  দরজায়। কোনোরকমে দুপুর কাটিয়ে রহমত আবারও বেরিয়ে যায় আবার কিছুর আশায়।
*
এই ভাবে ব্যর্থ আশার মধ্যেই বেঁচে থাকে ওদের লড়াই। বৈষম্যহীনতার মিথ্যে প্রলাপ বকে চলে একদল মানুষ। কোনো রোগ নয়, মহামারী নয়, একমাত্র মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই শেষ হয় সব ভেদ। তার আগে শুধু হয়তোশব্দটাকে আঁকড়ে বাঁচতে চায় কিছু মানুষ। বাস্তবে নয় কল্পনায় বেঁচে থাকে ঘরের দাওয়ায় একটা অপটু হাতে আঁকা মাছ। সাকিনার কান্নায় ভিজে যাওয়া অনাহারী আবদার!

-
রাহুল দাস


সূচীপত্র

1 comment: